মঙ্গলবার,  ০৬ ডিসেম্বর ২০২২

 

২২ অগ্রাহায়ণ ১৪২৯ ,  ১২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

ভাওয়ালের কন্ঠ :: Bhawaler Kontho - ভাওয়ালের খবর

কেন আমরা চুমু খাই

প্রকাশিত: ১৬:০৩, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২

কেন আমরা চুমু খাই

প্রেমময়তাকে গাঢ় করে তোলে চুম্বন। ছবি: সংগৃহীত

প্রিয় মানুষের সঙ্গে ডেট করার সময় আলটপকা চুমু খাওয়ার অভিজ্ঞতা নেই, এমন মানুষের সংখ্যা নগণ্য।

কিন্তু কেন আমরা চুমু খাই? কী ঘটে চুম্বনে? আবেগ প্রকাশের এই ভঙ্গিটি কেন এত আকাঙ্ক্ষিত?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন বিজ্ঞানীরা। দেখা গেছে, চুমুর গভীরে লুকিয়ে আছে শরীর ও মনের গভীর সংযোগ।

 

প্রাণীদের মধ্যে শুধু মানুষ কেন চুমু খায়

 

নিউ ইয়র্কের ইউনিভার্সিটি অ্যাট অ্যালবানির এভ্যুলিউশনারি সাইকোলজিস্ট অধ্যাপক গর্ডন গ্যালাপ জুনিয়রের মতে, আদিমকালে মা তার শিশুসন্তানকে যেভাবে খাইয়ে দিতেন, তা থেকেই চুম্বনের বিবর্তন।

আদি যুগে মায়েরা খাবার চিবিয়ে সেটি শিশুদের খাইয়ে দিতেন। জৈব-নৃতাত্ত্বিক হেলেন ফিশার মনে করেন, মানুষের বিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে সঙ্গী বেছে নেয়া ও প্রজনন।

তিনি বলেন, ‘আপনি যদি প্রেমে না পড়েন ও কোনো সঙ্গী খুঁজে না পান তাহলে আপনার সন্তান হবে না।’

আর এই প্রেমময়তাকে গাঢ় করে তোলে চুম্বন। হালকা চুমু থেকে শুরু করে গভীরতর অনেক ধরনের চুমু রয়েছে। তবে আবেগী রোমান্টিক ও যৌনতাপূর্ণ চুম্বনের রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। চুমু খাওয়ার অন্যতম সুবিধা হচ্ছে এর মাধ্যমে প্রচুর তথ্য আদান-প্রদান করা যায়, যা প্রচ্ছন্নভাবে চিরসঙ্গী খুঁজে নিতে মানুষকে সহায়তা করে।

ফিশার বলেন, ‘মানুষের দেহের অন্যতম পাতলা ত্বক রয়েছে ঠোঁটে। একই সঙ্গে ঠোঁটে রয়েছে অসংখ্য স্নায়ুর মুখ। এ কারণে ঠোঁটের মাধ্যমে মানুষ আরেকজনের তাপমাত্রা, স্বাদ ও গন্ধ অনুভব করতে পারে। গন্ধের মাধ্যমে মানুষ অন্যজনের স্বাস্থ্য, রোগপ্রতিরোধ সক্ষমতা ও উর্বরতা-সংক্রান্ত নানান তথ্য পায়।’

আর এ কারণেই অনেক সংস্কৃতিতে নির্দিষ্ট তথ্য জানার প্রয়োজনে চুমু খাওয়ার দরকার পড়ে না বলে মনে করেন ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অফ কেন্টের বিবর্তনবাদী-নৃতাত্ত্বিক সারাহ জোনস। যখন মানুষ কম কাপড় পরছে বা গোসল কম করছে, তখন এ তথ্যগুলো খুব কাছে না গিয়েও জানা সম্ভব।

সারাহ বলেন, ‘সমাজের উঁচু অবস্থানের কাউকে চুমু খেতে দেখলে বা কাউকে রোমান্টিকভাবে চুমু খেতে দেখার প্রভাবটি হচ্ছে অনেকেই তখন একই কাজ করতে চান।’

ফিশারের মতে, মানুষের সবচেয়ে কাছের প্রাণী প্রাইমেটদের মধ্যে চুমুর কাছাকাছি পর্যায়ের প্রক্রিয়া দেখা যায়। মুখ স্পর্শ করা, মুখ ঘষা বা মুখ চাটার অভ্যাস অনেক প্রজাতির প্রাণীর মধ্যেই রয়েছে।

গ্যালাপ বলেন, ‘দুটি প্রাণীর কাছাকাছি আসার মধ্যে একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়, আর সেটি হলো এরা প্রয়োজনীয় জিনগত ও প্রজননসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। আসলে এটি এক ধরনের সঙ্গী খোঁজার প্রক্রিয়া।’

 

চুমু কীভাবে সম্পর্কে প্রভাব ফেলে

চুমু এতটাই শক্তিশালী যে, কোনো সম্পর্ক বজায় থাকবে কি না সেটি অনেক সময় এর মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।

ইউনিভার্সিটি অফ আলাবামায় গ্যালাপ ও তার সহকর্মীদের করা এক গবেষণায় দেখা গেছে যে ‘চুক্তি ভঙ্গকারী চুম্বন’-এর অস্তিত্বও আছে। ফিশারের মতে, সেটি হলো ‘মৃত্যু চুম্বন’।

এক হাজার কলেজ শিক্ষার্থীর ওপর করা এক জরিপে দেখা গেছে, ছাত্র ও ছাত্রীরা কারও প্রতি আকর্ষণ বোধ করেছেন। তবে প্রথম চুম্বনের পর সেই আকর্ষণ কেটে গেছে। চুমুর কারণে এই সম্পর্কচ্ছেদ হলেও, এর মানে এই নয় যে তারা খারাপ চুম্বনকারী।

গ্যালাপ ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘কেউ হয়তো চুম্বনকারী হিসেবে কোনো সঙ্গীর কাছে খারাপ, আবার আরেকজনের কাছে ভালো। চুম্বনকারী হিসেবে কাউকে ভালো লাগা মানে হচ্ছে তার সঙ্গে আপনার জিনগত মিল রয়েছে।’

ফিশারের নেতৃত্বে ২০১৮ সালে অনলাইন ডেটিং সাইট ম্যাচ ডটকমের করা সিঙ্গলস ইন আমেরিকা শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, ৮১ শতাংশ পুরুষ ও ৬২ শতাংশ নারী নিজেদের প্রথম ডেটে চুমু খাওয়াকে সঠিক মনে করেন না। এ থেকে ধারণা পাওয়া যায়, চুমু আসলে সঙ্গী যাচাই-বাছাই করার অন্যতম পদ্ধতি। তবে নারী ও পুরুষের কাছে চুমু খাওয়ার সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন কারণ রয়েছে।

গ্যালাপের মতে, পুরুষেরা চুমু খান যৌনসুবিধা পেতে বা কোনো সমস্যা মিটিয়ে ফেলার উদ্দেশ্যে। আর নারীরা চুমু খান রোমান্টিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে বা সম্পর্ক কী অবস্থায় আছে সেটি জানার জন্য।

ফিশার বলছেন, ভবিষ্যতে কী হতে পারে সেটা জানার উপায় হিসেবেও নারীরা চুম্বনকে ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নও হাজির করেন। যেমন: তিনি কি ব্যক্তিটিকে যথেষ্ট পছন্দ করেন? দুজনে একটি ভালো জুটি হতে পারবেন? অথবা দুজনে কি যথেষ্ট ধৈর্যশীল?

 

চুমু এত আকর্ষণীয় কেন

 

ঠোঁটের লাখ লাখ স্নায়ু চুম্বনের মাধ্যমে সক্রিয় হয়ে মস্তিষ্কে সংকেত পাঠালে তীব্র সুখানুভূতি তৈরি হয়।

গ্যালাপের মতে, অনেকেই তার প্রথম চুম্বনের অভিজ্ঞতা প্রথম যৌন অভিজ্ঞতার চেয়েও নিঁখুতভাবে মনে রাখতে পারেন। এর সঙ্গে ফিশার যোগ করেন, চুমু মস্তিষ্কের ডোপামিন সিস্টেমকে চালু করে দিয়ে মানুষকে প্রেমের দিকে ধাবিত করতে পারে। ডোপামিন ভালোবাসার অনুভূতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

ফিশার বলছেন, মানুষ যৌনমিলন ও প্রজননের জন্য মস্তিষ্কের তিনটি স্বতন্ত্র সিস্টেম তৈরি করেছে। এগুলো হলো- যৌনতার অনুভূতি পরিচালনা, তীব্র রোমান্টিক প্রেমের অনুভূতি ও গভীর আকর্ষণের অনুভূতি।

লালায় প্রচুর পরিমাণে টেস্টোটেরন থাকে, যা যৌন তাড়নাকে পরিচালিত করে। আর গালের ভেতরের কোষগুলো টেস্টোটেরন গ্রহণ করে। ফলে ওয়েট কিস (সিক্ত চুম্বন) যৌন তাড়না সৃষ্টি করে। এ সময় ডোপামিন রোমান্টিক প্রেম জাগিয়ে তোলে। সেই সঙ্গে মস্তিষ্কে প্রভাব রাখে অক্সিটোসিন। যাকে সাধারণত ‘কাডল হরমোন’ বলা হয়।

ফিশারের মতে, অক্সিটোসিন মানসিক ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি তৈরি করে এক ধরনের মহাজাগতিক মিলন ঘটায়। দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকা যুগলের ক্ষেত্রে চুমু শুধু অক্সিটোসিনের মাত্রাই বাড়ায় না; একই সঙ্গে দেহে স্ট্রেস বা চাপের জন্য দায়ী কোর্টিসল হরমোনের মাত্রাও কমিয়ে দেয়। যে কারণে সঙ্গীর সঙ্গে মিলনের জন্য চুমু অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার।

সোজা কথায় চুমুকে সহজভাবে ব্যাখ্যা করার কোনো উপায় নেই।

গ্যালাপ বলেন, ‘এটা দেহের মধ্যে সংযুক্ত, বিবর্তিত, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অচেতন এক মিথষ্ক্রিয়া, যা প্রজননের জৈবিক দায়িত্ব পালন করে এবং যার সম্বন্ধে বেশির ভাগ লোকের কোনো ধারণা নেই।’

জীবনের অন্য অনেক কিছুর মতোই, চুমু কীভাবে আমাদের আচরণকে প্রভাবিত করে তার ওপরেও মানুষের নিয়ন্ত্রণ নেই। আমরা শুধু এ মুগ্ধ যাত্রার অংশীদার।

শেয়ার করুন:

সর্বশেষ

সর্বাধিক জনপ্রিয়